হাকালুকি হাওর হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম হাওর যেটি ক্রমাগত হয়ে পড়ছে সংকটাপন্ন

হাকালুকি বা হাকালুকি হাওর বা হাকালুকি হাওড় (ইংরেজি: Hakaluki Haor) হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম হাওর যেটি ক্রমাগত হয়ে পড়ছে সংকটাপন্ন। এই হাওর হাকালুকি গত এক দশক ধরেই অরক্ষিত। নানা কারণেই হুমকির মুখে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র এবং সরকার ঘোষিত মৎস্য অভয়াশ্রম। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোপালগঞ্জ উপজেলাজুড়ে হাকালুকি হাওড়ের অবস্থান। এর আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। ছোট-বড় ২৩৮টি বিল নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকির আয়তন বর্ষা মৌসুমে ২৪ হাজার ৭০০ হেক্টরে বিস্তৃত হয়। হাকালুকি হাওরকে মিঠা পানির মাছের অন্যতম প্রজননকেন্দ্রও বলা হয়। হাওর তীরের প্রায় দুই লাখ মানুষ জীবন ও জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এই হাওরের উপর নির্ভরশীল।

হাওর

হাওর বা হাওড় হচ্ছে সসার আকৃতির নিম্নভূমি বা জলাভূমি। এটি বাংলাদেশের সিলেট বা ভাটি অঞ্চলে দেখা যায়। হাওড় অঞ্চল মূলতঃ সিলেটের উত্তর পূর্বাংশের পাহাড়ি অঞ্চল ব্যতীত পুরাে এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৪৫০৫.২০ বর্গ কি. মি.। সসার আকৃতির নিম্নভূমি গত ২০০ বছরে প্রায় ৯ থেকে ১২ মিটার নিচে ডেবে গেছে। হাওড় অঞ্চলটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: মধ্যভাগ, সুসাং অঞ্চল, মেঘালয়, পাদভূমি অঞ্চল এবং সিলেটের মধ্যভাগের নিম্নভূমি। মধ্যভাগের উচ্চতা সমুদ্র সমতলের কাছাকাছি। এ অঞ্চলে বিল ও হাওড়ের বিন্যাস নদীর বিচ্ছিন্ন অংশ, প্রাকৃতিক বাঁধ, নিচু চর ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত। উচু পাড়গুলিকে কান্দা বলে। সুসাং অঞ্চলে সুসাং পাদদেশিয় সমভূমি এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র প্লাবন ভূমির মাঝখানে নিম্নভূমি আছে যা বন্যার সময় গভীর পানিতে মগ্ন হয়। মেঘালয় পাদভূমির অঞ্চলে রক্ষা নদী থেকে লুবা নদী পর্যন্ত নিম্নাঞ্চল ও হাওড় অঞ্চলের অন্তর্গত। এখানে সর্বনিম্ন ভাগ হচ্ছে টাঙ্গুয়া হাওড় এলাকা। মধ্য সিলেটের হাওড় সমূহের মধ্যে হাকালুকি হাওড় অন্যতম। জুরি ও কুশিয়ারা নদী বাহিত পলি দ্বারা এ হাওড় দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন:  হাওর

হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র

এই হাওরে ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাংলাদেশে জলজ উদ্ভিদ প্রজাতির অর্ধেকেরও বেশি হাকালুকি হাওরে জন্মে। এছাড়া হাওর এলাকায় ১১২ প্রজাতির পরিযায়ী এবং ৩০৫ প্রজাতির স্থানীয় পাখি বিচরণ করে। এখানে ১২ প্রজাতির উভচর, ৭০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২ প্রজাতির কচ্ছপ, ১০৭ প্রজাতির মাছ রয়েছে।

বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদফতর সিবিএ-ইসিএ নামে একটি প্রকল্প চালু করতে চেয়েছিল যার লক্ষ্য হলো প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পরিবেশভিত্তিক সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে জলবায়ু ও জীবন ধারার উন্নয়ন। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা সোনাদিয়া ও কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকত এবং হাকালুকি হাওরে তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প জুলাই ২০১০ থেকে জুন ২০১৩ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পে এখনও লোক নিয়োগ দেয়াই হয়নি। এই প্রকল্পটি চালু হলে পরিবেশ রক্ষা, হাওর এলাকার দরিদ্র মৎস্যজীবিদের বিকল্প পেশায় উৎসাহিত করা এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে হাওরপাড়ের লোকজনকে ধারণা দেয়া যেত। বর্তমানে এই অরক্ষিত হাওরে হরিলুট চলছে মৎস্য অভয়াশ্রমের মাছ। এছাড়া পাখি নিধন, জলজ উদ্ভিদের ক্ষতিসাধন, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি যেভাবে চলছে সেরকম অবাধে চলতে থাকলে মিঠা পানির এই মৎস্য ভাণ্ডারটি অচিরেই মাছশূন্য হয়ে পড়বে।

রচনাকালঃ ৮ জুন, ২০১২

1 thought on “হাকালুকি হাওর হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম হাওর যেটি ক্রমাগত হয়ে পড়ছে সংকটাপন্ন”

Leave a Comment

error: Content is protected !!